Friday 26 April 2013

সাভার-বিপর্যয়ের ঘটনায় জিএসপি নিয়ে নতুন প্রশ্ন

সাভারে ভবনধসের বিয়োগান্ত ঘটনা যুক্তরাষ্ট্রে বাংলাদেশের পণ্যের অগ্রাধিকারমূলক বাজারসুবিধা (জিএসপি) অব্যাহত রাখার সিদ্ধান্তকে প্রভাবিত করবে। অসংখ্য প্রাণহানি আর হতাহতের ঘটনায় সরকারের পক্ষে এটিকে আর নিছক দুর্ঘটনা বলার সুযোগ নেই। বরং এ ভয়াবহ দুর্ঘটনার জন্য দায়ী ব্যক্তিদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নিয়ে সরকারকে প্রমাণ করতে হবে, শ্রমিকের নিরাপত্তায় সরকার আন্তরিক। 
ঢাকা ও ওয়াশিংটনের কূটনৈতিক সূত্রগুলো বাংলাদেশের জিএসপি-ভাগ্য নির্ধারণে সাভারের ভবনধসের বিষয়টিকে গুরুত্বপূর্ণ মনে করছে। কারণ, জিএসপির শুনানিতে শ্রমিকদের সুরক্ষার অঙ্গীকার করেছে বাংলাদেশ। যদিও সরকার মনে করে, গত মার্চের শুনানির পর যুক্তরাষ্ট্রের উত্থাপিত নতুন ১৯টি প্রশ্নের যথেষ্ট ভালো জবাব দিয়েছে বাংলাদেশ। এ ছাড়া সম্প্রতি শ্রম আইন সংশোধন করে পোশাকশিল্পের কর্মীদের সংগঠিত হওয়ার অধিকার দেওয়ায় বাংলাদেশের জিএসপি অব্যাহত রাখার পথ সুগম হবে।
তবে ঢাকায় নিযুক্ত মার্কিন রাষ্ট্রদূত ড্যান ডব্লিউ মজীনা গতকাল বৃহস্পতিবার সকালে সাংবাদিকদের প্রশ্নের উত্তরে বলেছেন, কর্মপরিবেশের প্রেক্ষাপটে সাভারের ভয়াবহ দুর্ঘটনা জিএসপির সিদ্ধান্ত গ্রহণের প্রক্রিয়ায় প্রভাব ফেলবে।  
News In Bangladesh
জানতে চাইলে বাণিজ্যসচিব মাহবুব আহমেদ গতকাল বৃহস্পতিবার প্রথম আলোকে বলেন, শুনানির পর যুক্তরাষ্ট্রের উত্থাপিত নতুন ১৯টি প্রশ্নের উত্তর ২৪ এপ্রিল আনুষ্ঠানিকভাবে দেওয়া হয়েছে। এ ক্ষেত্রে সরকারের নেওয়া পদক্ষেপ সুনির্দিষ্টভাবে জানানো হয়েছে। সার্বিকভাবে যে বিষয়গুলোতে তাদের উদ্বেগ ছিল, তা নিয়ে সরকারের অবস্থান খুব স্পষ্ট করেই জানানো হয়েছে।
সাভারের ভবনধসের ঘটনা মার্কিন বাজারে বাংলাদেশের জিএসপি অব্যাহত রাখার সিদ্ধান্তে নেতিবাচক প্রভাব ফেলবে বলে রাষ্ট্রদূত ড্যান ডব্লিউ মজীনার বক্তব্যের ব্যাপারে দৃষ্টি আকর্ষণ করা হলে কোনো মন্তব্য করতে অপারগতা জানিয়েছেন বাংলাদেশের বাণিজ্যসচিব। তবে মার্কিন কর্মকর্তাদের উদ্ধৃত করে মাহবুব আহমেদ এই প্রতিবেদককে জানিয়েছেন, মে মাসের শেষ সপ্তাহে কিংবা জুন মাসের শুরুতে বাংলাদেশের জিএসপির ভাগ্য নির্ধারিত হবে। 
প্রসঙ্গত, যুক্তরাষ্ট্রে জিএসপি অব্যাহত রাখার লক্ষ্যে শ্রমমান নিয়ে মার্কিন উদ্বেগ দূর করতে ২৭ এপ্রিলের মধ্যে বাংলাদেশকে সুনির্দিষ্টভাবে অঙ্গীকার করতে হবে। এ ব্যাপারে তৈরি পোশাকশিল্প, রপ্তানি প্রক্রিয়াজাতকরণ এলাকা (ইপিজেড) ও হিমায়িত খাদ্যের বিষয়ে নতুন করে ১৯টি প্রশ্নের জবাব চেয়েছে যুক্তরাষ্ট্র। এর আগে বাংলাদেশের জিএসপি-ভাগ্য নির্ধারণের লক্ষ্যে গত ২৮ মার্চ মার্কিন বাণিজ্য দপ্তরের (্ইউএসটিআর) উপকমিটিতে এর আহ্বায়ক উইলিয়াম জ্যাকসনের সভাপতিত্বে প্রায় দুই ঘণ্টার শুনানি হয়েছে। শুনানিতে বাংলাদেশের নেতৃত্ব দেন বাণিজ্যসচিব মাহবুব আহমেদ। 
শুনানিতে বাংলাদেশের জবাব যুক্তরাষ্ট্রকে মোটেই সন্তুষ্ট করতে পারেনি। শুধু যুক্তরাষ্ট্র নয়, বাংলাদেশের কূটনীতিকেরাও এমনটা মনে করেন। 
যুক্তরাষ্ট্রের হতাশা: ওয়াশিংটনের কূটনৈতিক সূত্রে জানা গেছে, শুনানির সময় যুক্তরাষ্ট্রের পক্ষ থেকে বলা হয়, বাংলাদেশের পক্ষ থেকে আরও গোছালো বক্তব্য প্রত্যাশা করেছিল ওয়াশিংটন। অর্থাৎ যে বিষয়গুলো নিয়ে জনসমক্ষে আলোচনা চলছে, তা নিয়ে বাংলাদেশ সরকারের পক্ষ থেকে সুনির্দিষ্ট বক্তব্য প্রত্যাশিত ছিল। সরকার এ পর্যন্ত যেসব পদক্ষেপ নিয়েছে, সে ব্যাপারে বাংলাদেশ আরও ভালোভাবে নিজেদের অবস্থান তুলে ধরতে পারত। সেই সঙ্গে বক্তব্য উপস্থাপনের সময় ব্যক্তিগত দৃষ্টিভঙ্গির বহিঃপ্রকাশ এড়িয়ে চলা উচিত ছিল বলেও মনে করে মার্কিন পররাষ্ট্র দপ্তর ও ইউএসটিআর।
এ ব্যাপারে তারা পরামর্শ দিয়েছে যে, বাংলাদেশের জিএসপি-ভাগ্য জুন মাসের শেষে নির্ধারণ হলেও এপ্রিল-মে মাস বাংলাদেশের জন্য খুব গুরুত্বপূর্ণ। এ প্রেক্ষাপটে শুনানিতে বাংলাদেশ যে বক্তব্য তুলে ধরেছে, তার মধ্যে সুনির্দিষ্টভাবে ইপিজেড, বাংলাদেশ সেন্টার ফর ওয়ার্কার্স সলিডারিটির (বিসিডব্লিউএস) নিবন্ধন এবং বাবুল আক্তার ও কল্পনা আক্তারের মামলা প্রসঙ্গে সরকারের বক্তব্যে মোটেই সন্তুষ্ট হতে পারেনি যুক্তরাষ্ট্র। তারা বিশ্বাস করে, এ ব্যাপারে সরকারের দেওয়া বক্তব্য বিভ্রান্তিমূলক ও হতাশাব্যঞ্জক। এমনকি এ ব্যাপারে সরকার যে দৃষ্টিভঙ্গি অতীতে প্রকাশ করেছিল, তারও বিচ্যুতি ঘটেছে। 
বাংলাদেশের জিএসপি-সুবিধা বাতিলের পক্ষে মার্কিন বাণিজ্য প্রতিনিধির দপ্তরে সেখানকার শ্রমিক সংগঠন ও মানবাধিকার সংস্থাগুলোর পক্ষ থেকে ব্যাপক চাপ রয়েছে। এসব গোষ্ঠী মনে করে, জিএসপি বাতিল হলেই কর্মপরিবেশ উন্নয়নে সচেষ্ট হবে বাংলাদেশ। 
পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের একজন কর্মকর্তা বলেন, অতীত অভিজ্ঞতার প্রেক্ষাপটে বাংলাদেশের আশ্বাসে সন্তুষ্ট হতে পারছে না যুক্তরাষ্ট্র। কারণ, সংকট থেকে পরিত্রাণ পেতে অতীতেও অনেক আশ্বাস দিয়েছিল বাংলাদেশ। কিন্তু এরপর সে আশ্বাসগুলো পূরণ করতে ব্যর্থ হয়েছে বাংলাদেশ।
নতুন ১৯টি প্রশ্ন: যুক্তরাষ্ট্র বাংলাদেশের জন্য নতুন করে যে ১৯টি প্রশ্ন তৈরি করেছে, তার মধ্যে বাংলাদেশের বিরুদ্ধে পিটিশন দাখিলকারী দি আমেরিকান ফেডারেশন অব লেবার অ্যান্ড কংগ্রেস অব ইন্ডাস্ট্রিয়াল অর্গানাইজেশনকে (এএফএল-সিআইও) দুটি প্রশ্নের জবাব দিতে হবে। ১১ এপ্রিল এ প্রশ্নগুলো নতুন করে তুলেছে মার্কিন বাণিজ্য দপ্তর। প্রশ্নগুলোর মধ্যে পোশাকশিল্পের বিষয়ে সাতটি, রপ্তানি প্রক্রিয়াজাতকরণ এলাকা-সম্পর্কিত চারটি, অগ্নিকাণ্ড বিষয়ে তিনটি এবং চিংড়ি ও মৎস্য খাতের বিষয়ে চারটি প্রশ্ন রয়েছে। 
পাশ কাটানোর সুযোগ নেই: ঢাকা ও ওয়াশিংটনের কূটনৈতিক সূত্রগুলো বলেছে, গত ২৮ মার্চের শুনানিতে বাংলাদেশের উত্তর সন্তোষজনক না হলেও গত বুধবার পাঠানো ১৯টি প্রশ্নের উত্তর সন্তোষজনক হয়েছে। বিশেষ করে যে বিষয়গুলোতে যুক্তরাষ্ট্রের উদ্বেগ ছিল, তা নিয়ে সরকার অস্পষ্টতা দূর করেছে। 
তবে নতুন করে সংকট তৈরি করেছে সাভারের ভবনধসের ঘটনা। এ ঘটনা প্রমাণ করেছে যে, শ্রমিকদের সুরক্ষা ও তাঁদের কর্মপরিবেশের নিরাপত্তা নিশ্চিতের প্রতি অবহেলা রয়েছে। তাঁদের অধিকারের ব্যাপারে কর্তৃপক্ষের কোনো শ্রদ্ধা নেই। এ পরিস্থিতিতে সাভারের ঘটনায় দায়ী ব্যক্তিদের বিরুদ্ধে কার্যকর আইনি পদক্ষেপ নিয়ে সরকারের প্রমাণের সুযোগ এসেছে, শ্রমিকের স্বার্থরক্ষায় বাংলাদেশের দেওয়া অঙ্গীকারের প্রতি সরকারের আন্তরিকতা রয়েছে। 
গবেষণা প্রতিষ্ঠান সেন্টার ফর পলিসি ডায়ালগের (সিপিডি) নির্বাহী পরিচালক মোস্তাফিজুর রহমান গত মার্চের শুনানিতে ওয়াশিংটনে বাংলাদেশের পক্ষে অংশগ্রহণ করেছিলেন। গতকাল প্রথম আলোকে তিনি বলেন, সাভারের ঘটনার পরিপ্রেক্ষিতে যে সংকট তৈরি হয়েছে, তা দূর করতে হলে ওই ঘটনায় দায়ী ব্যক্তিদের দৃষ্টান্তমূলক শাস্তিদানের বিষয়টি নিশ্চিত করতে হবে। এটি হলেই যুক্তরাষ্ট্রের কাছে এ বার্তা যাবে যে, ভবিষ্যতে এ ধরনের ঘটনা রোধে এবং শ্রমিকদের নিরাপত্তায় সরকার প্রকৃত অর্থেই আন্তরিক।
‘প্রভাব ফেলবে জিএসপিতে’: সাভারের ঘটনা বাংলাদেশের জিএসপি-ভাগ্য নির্ধারণী প্রক্রিয়ায় প্রভাব ফেলবে কি না, তা মার্কিন রাষ্ট্রদূতের কাছে জানতে চাওয়া হয়েছিল। ড্যান মজীনা বলেন, ‘এটি কর্মপরিবেশের নিরাপত্তা নিয়ে প্রশ্ন তুলবে। আমি নিশ্চিত, এ ঘটনা অবশ্যই প্রভাব ফেলবে।’
ঢাকায় যুক্তরাষ্ট্রের শীর্ষ এই কূটনীতিক গণমাধ্যমকর্মীদের জানিয়েছেন, ‘জিএসপির শুনানিতে যেসব বিষয়ে উদ্বেগ জানানো হয়েছে, সে ব্যাপারে বাংলাদেশের ইতিবাচক পদক্ষেপগুলো মার্কিন কর্মকর্তাদের কাছে যথাযথভাবে তুলে ধরার প্রয়াস চালাবেন। অনেক ক্ষেত্রেই যথেষ্ট অগ্রগতি হয়েছে। তবে আরও উন্নতির সুযোগ রয়েছে। আমি এ বিষয়টি ব্যাখ্যা করব। তবে সিদ্ধান্ত নেওয়া আমার কাজ নয়। সিদ্ধান্ত যাঁরা নেন, তাঁদের কাছে সঠিক তথ্য পৌঁছে দেওয়াটা আমার কাজ।’

0 comments:

Post a Comment